ভোটের মাঠে সম্ভাব্য সংঘাত-সহিংসতার শঙ্কায় আছেন নির্বাচনি কর্মকর্তারা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন এবং এরপর স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক গোলযোগের প্রেক্ষাপটে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে তালিকাভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে। এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে দলীয় পরিচয়সহ ঠিকুজির সন্ধান করায় নতুন করে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন সরকারি ও সরকারি সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে অনীহা কাজ করছে তাদের অনেকের মধ্যে। নানা অজুহাত দেখিয়ে তারা নির্বাচন থেকে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি অফিসসহ রিটার্নিং অফিসে আবেদন করছেন। অবশ্য এবারের নির্বাচনে দেশের প্রায় সব দলের অংশগ্রহণের ঘোষণায় কিছুটা হলেও স্বস্তিবোধ করছেন তারা।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট নেওয়া হবে। দেশের ৩০০টি আসনে ৪০ হাজার ১৯৯টি কেন্দ্রে দুই লাখের বেশি ভোটকক্ষ থাকবে। একজন প্রিজাইডিং অফিসার, দুই বা ততোধিক সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং প্রতিটি ভোটকক্ষে অন্তত দুইজন পোলিং অফিসার মিলিয়ে কেন্দ্রপ্রতি ভোটার সংখ্যার বিবেচনায় ১০ থেকে ২০ জন নির্বাচনি কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া ৫ থেকে ১০ শতাংশ কর্মকর্তা থাকবেন রিজার্ভ হিসেবে। সব মিলিয়ে সাত লাখের বেশি নির্বাচনি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন আগামী জাতীয় নির্বাচনে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে এরই মধ্যে নির্বাচনি কর্মকর্তার তালিকা তৈরির জন্য ইসি থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনও প্রার্থীর অধীনে কোনও সময় চাকরি করেছেন, এমন ব্যক্তিদের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া যেসব কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে তাদেরও নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিএনপি ও তাদের মিত্রদের বর্জনের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশব্যাপী ব্যাপক সহিংসতা হয়। ওই নির্বাচনের ভোটের দিনই ১৯ জন নিহত হন। ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত নিহত হন ১২৩ জন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, নির্বাচনের সময় সহিংস ঘটনায় তিনজন নির্বাচন কর্মকর্তা নিহত এবং ৩৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হন। আহতদের তালিকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আছেন।

নির্বাচনি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত এমন দেড় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুড়িয়ে দেওয়াসহ ব্যাপক ভাঙচুর হয়। গত সংসদি নির্বাচনে পাঁচ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেকগুলো পর্যবেক্ষক সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষন বন্ধ রাখে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে গত পাঁচ বছরে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ব্যাপক সহিংসতা হয়। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হতাহতের ঘটনা অতীতের সব কেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এসব নির্বাচনে ভোটার, সাধারণ মানুষ ছাড়াও নির্বাচনি দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারাও আহত হন। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্র থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে নির্বাচনি কর্মকর্তারা বের হতে না পারলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর ঘটনাও ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহীসহ বেশ কিছু অঞ্চল থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, নির্বাচনি তালিকা তৈরির সময় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের নাম তালিকাভুক্ত না করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা নির্বাচন অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এক্ষেত্রে কেউ কেউ অসুস্থতাসহ নানা কারণ দেখানোর চেষ্টা করছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদবির করানোর ঘটনাও ঘটছে। পক্ষ থেকে রাজধানী ও তার আশপাশের কয়েকটি নির্বাচনি কার্যালয়ে গিয়েও একই চিত্র পাওয়া গেছে। নির্বাচনি দায়িত্বের তালিকা থেকে নাম কাটানোর তদবিরে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

দায়িত্ব পালনে অনীহা আছে এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে। দায়িত্ব পালনে অনীহার কারণ তারা জানালেও নিজেদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করতে চাননি। নির্বাচনি দায়িত্ব পালন না করার কারণ হিসেবে লিখিত বা মৌখিক আবেদনে পারিবারিক সমস্যার কথা জানালেও মূলত সংহিসতার আশঙ্কার কারণেই তারা দায়িত্ব থেকে দূরে থাকতে চাইছেন বলে কাছে স্বীকার করেন। অবশ্য দু’-একজনের আবেদনের পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন এবং পরবর্তী নির্বাচনের সময়ের ঘটনা তুলে ধরে তারা বলেছেন, আগে নির্বাচনকে তারা উৎসব হিসেবে মনে করতেন। প্রতি পাঁচ বছরে ২/৩ বার নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে তাদের মধ্যে নতুন অনুভূতি কাজ করতো। কিন্তু এখন এটা আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রামের মহানগরীরকে কর্মরত সরকারের একটি দফতরের কর্মচারী আহসান হাবীব জানান, নির্বাচনি দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকতে তিনি স্থানীয় নির্বাচন অফিসে যোগোযোগ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘তারা বিষয়টি দেখবেন বলেছেন। তবে আশ্বস্ত হতে পারিনি।’ কেন দায়িত্ব পালন করতে চান না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার শারীরিক কিছুটা অসুস্থতা রয়েছে, টানা অনেকক্ষণ কাজ করতে পারি না। এরপর নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে কী হয় না হয়, সেটা তো বলা যায় না!’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দিনাজপুর জেলার একটি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেন, ‘দশম সংসদ নির্বাচনের সময় সংসদ নির্বাচনে তিনি যে কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন তাতে দুর্বৃত্তরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। অন্যান্য নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিয়ে কোনোমতে নিজেদের রক্ষা করতে পারলেও নির্বাচনি সামগ্রী তারা রক্ষা করতে পারেননি। সেই ঘটনার পর নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করতে মন সাড়া দেয় না। কিন্তু কী-ই বা করার আছে? সরকারি দায়িত্ব পালন তো করতেই হবে।’

ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘আগে-পরে অনেকবারই নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু এবার যেটা শুরু হয়েছে তাতে আতঙ্ক কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাড়িতে এসে আমাদের খোঁজ নিচ্ছে। সব ঠিকানা জানার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাচ্ছেন। এটা সত্যি বিব্রতকর। দায়িত্ব দেওয়ার আগে যেভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে, পরে কী হবে— সেটা নিয়েই টেনশনে আছি!’

খুলনা সদর থানা এলাকায় কর্মরত একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন আমাদের করতে হয়। কিন্তু পরিবারের কেউ চান না, আমি নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করি। নির্বাচনি দায়িত্বে গেলে আমাদের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। কখন কী হয়, এটা নিয়ে উদ্বেগে থাকতে হয়। আগে এই পরিস্থিতি না হলেও কয়েক বছর ধরে এই আশঙ্কা কাজ করছে।’

সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিন জানান, উপজেলা নির্বাহী অফিস ও উপজেলা নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করেন তারা। তালিকা তৈরি করার সময় সরকারি-বেসরকারি কর্মকার্তাদের মধ্যে মিশ্র অবস্থান পাওয়া যায়। অনেক সময় দেখা যায় আগ্রহ প্রকাশ করে কেউ কেউ দায়িত্ব নেন। আবার অনেকে নাম কাটানোর জন্য তদবির করেন। আর নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিলেই তারা ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে চান না। এবার দায়িত্ব পালনের আগ্রহ প্রকাশ করে কোনও তদবির চোখে পড়েনি। বরং অন্যবারের তুলনায় নাম কাটানোর তদবির কিছুটা বেশি দেখা গেছে।

রংপুর বিভাগের একজন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জানান, অতীতে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করতে খুব একটা বেগ পেতে হতো না। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের সময় থেকে অনেকের মধ্যে দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। সহিংসতার আশঙ্কায় অনেকে দায়িত্ব যাতে না দেওয়া হয় সে জন্য তদবির করতে আসেন। তাদের মধ্যে একটি ভয় কাজ করে। তবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারো তদবির রাখা সম্ভব হয় না। এবারের সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনি কর্মকর্তার প্যানেল তৈরির সময় অনেকের মধ্যে দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা।

চট্টগ্রাম জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনীর হোসাইন খান বলেন, ‘কর্মকর্তা চেয়ে পাঠানো চিঠির জবাবে কিছু কর্মকর্তা দায়িত্বে না থাকার কথা জানিয়েছেন। এখানে অসুস্থতা, আবার অনেকেই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়েছেন। যারা নানা সমস্যা-অজুহাত দেখিয়েছেন তাদের যাবতীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করবে নির্বাচন কমিশন।’ যৌক্তিক কারণ ছাড়া কোনও কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন না করে পার পাবেন না বলেও তিনি জানান।

ঢাকা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (উপসচিব) ফয়সল আহমেদ বলেন, ‘অনেকেই দায়িত্ব পালনে অনীহা জানিয়ে তাদের কাছে আবেদন করেছেন। অবশ্য বেশির ভাগ আবেদনের কারণ পারিবারিক। এর মধ্যে যাচাই করে যৌক্তির কারণ থাকলে সেগুলো বাদ দিয়ে রিজার্ভ থেকে সেখানে নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে কারণ যৌক্তিক না কলে নির্বাচনি দায়িত্ব পালন না করার সুযোগ কারো নেই।’

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। যৌক্তিক কারণ থাকলে কেউ দায়িত্ব পালন না করতেই পারেন। তবে কোনও অজুহাত দেখিয়ে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে কোনও শৈথিল্য বা অবহেলা দেখানোর সুযোগ নেই। এরকম হলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নিরাপত্তা বিষয়ে এই কমিশনার বলেন, ‘ভোটার, ভোটের সামগ্রী ও নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। সেই অনুযায়ী অবশ্যই আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেবো। আর ২০১৪ সালের নির্বাচনের যে কথা বলছেন, আমার মনে হয় না এবার সেই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। কারণ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এক তরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।যার কারণে নির্বাচনে দেশব্যাপী ব্যাপক সহিংসতা হয়। কিন্তু এবার আমরা দেখছি সকলেই নির্বাচনে আসছেন। আর নির্বাচন অংশগ্রহনমূলক হলে স্বাভাবিকভাবেই তা শান্তিপূর্ণ হয়।’

উৎসঃ  বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুনঃ ৬৪ জেলার উপদেষ্টা (মেনটর) নিয়োগ করে তা আবার বাতিল করা হয়েছে


উন্নয়ন প্রকল্প তদারকির নামে বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান ৪৫ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ৬৪ জেলার উপদেষ্টা (মেনটর) নিয়োগ করে তা আবার বাতিল করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত আদেশও জারি করা হয়েছে। ওই আদেশ কৌশলগত কারণে ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়নি। তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তালিকায় ছিলেন সাবেক ও বর্তমান সচিব এবং অতিরিক্ত সচিব। তাদের অধিকাংশকে নিজ নিজ জেলার তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিনেই তাদের নিয়োগ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তফসিলের পর থেকে যেকোনো ধরনের নিয়োগ ও বদলির এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের।

নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এ ধরনের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে খোদ প্রশাসনেই।

বিষয়টি নজরে আসায় গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দেয় বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে সরকারের এ আদেশ বাতিলের দাবি করা হয়। অবশ্য বিএনপির এ আবেদনের আগেই আদেশটি বাতিল করা হয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়। ব্যাকডেটে (পূর্বের তারিখে) এ আদেশ বাতিল করা হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। মেনটর নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ইসির সচিবসহ ৩৮জন বর্তমান ও সাবেক সচিব এবং ৭জন অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন। এ তালিকায় কয়েকজন সিনিয়র সচিবও রয়েছেন।

গতকাল বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) দেয়া এক চিঠিতে এ দাবি জানিয়ে বলা হয়েছে, এ ধরনের দায়িত্ব প্রদান নির্বাচনকে চরমভাবে প্রভাবিত করবে এবং রিটার্নিং অফিসারদের ওপর অযাচিত প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরি করবে। এ আদেশ বাতিল করা না হলে প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইন-আদালতের আশ্রয় নেয়া হবে। গতকাল দুপুরে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দলের পক্ষে পাঁচটি চিঠি ইসিতে দিয়ে আসেন। এর মধ্যে একটিতে ৪৫ জন উপদেষ্টা নিয়োগ আদেশ বাতিল ও আরেকটিতে প্রশাসনে বদলির দাবি জানানো হয়। এরপরই বিকালে কমিশনের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্তের কথা সাংবাদিকদের জানান ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। সচিব বলেন, ৪৫ জন মেনটর নিয়োগ সংক্রান্ত আদেশ ১৩ই নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ স্থগিত করেছে। তিনি জানান, জেলা প্রশাসনে মেনটর নিয়োগ পূর্ব প্রচলিত। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এটা রুটিন কাজ। এ আদেশটি কমিশন অবহিত নয়।

৮ই নভেম্বর আদেশটি জারি হয়েছিল। ১৩ই নভেম্বর স্থগিত করা হয়েছে। ইসি সচিবের বিরুদ্ধে বিএনপির অভিযোগ নিয়ে হেলালুদ্দীন জানান, সচিব ইসির মুখপাত্র। ইসি সচিবের আলাদা সত্ত্বা নেই। কমিশনই সব সিদ্ধান্ত নেয়; সচিব তা বাস্তবায়ন করে ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে। এর আগে বিএনপির দাবি প্রসঙ্গে মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, তফসিল ঘোষণার দিন গত ৮ই নভেম্বর ৪৫ জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। আমরা মনে করি, নির্বাচনের আগের-পরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের নগ্ন পদক্ষেপ এটি। এক প্রশ্নের জবাবে ইসির সচিবকে উদ্ধৃত করে আলাল বলেন, তাদের দায়িত্ব দেয়ার কথা তিনি শুনেছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। তবে তিনি চিঠি পাননি। তিনি বলেন, সবার জন্য সমান সুযোগ এখন নেই। ইসি যদি তাদের অপসারণ করতে না পারে তাহলে কমিশন সবার দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হবে। সমান সুযোগ তৈরি করা কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে ৪৫জন কর্মকর্তার নামের তালিকা ইসিতে জমা দেয়া হয়েছে।

ওই চিঠির সঙ্গে গত ৮ই নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা একটি আদেশের কপিও জমা দেয়া হয়। ওই আদেশে ৪৫জন সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার নাম, পদবি ও কোন জেলার পরামর্শক হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তা উল্লেখ রয়েছে। ৪৫জন উপদেষ্টার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়ে বিএনপির চিঠিতে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার দিন ৮ই নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৪৫জন কর্মকর্তাকে ৪৫ জেলার পরামর্শক নিয়োগ দেয়ায় আমরা বিস্মিত হয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ও প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলো নির্বাচনকালীন সময়ে বাস্তবায়ন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ব্যাহত করবে, যা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অজানা নয়। এতে বলা হয়, উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সকলেই রিটার্নিং অফিসারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাদের অধিকাংশকে নিজ জেলায় দায়িত্ব দেয়া হয়েছে; যা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের (জেলা প্রশাসক) নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনকে নিশ্চিতভাবে বিঘ্নিত ও বিব্রত করবে। চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, এ ধরনের দায়িত্ব প্রদান নির্বাচনকে চরমভাবে প্রভাবিত করবে এবং রিটার্নিং অফিসারদের ওপর অযাচিত প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরি করবে।

যে ৪৫ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল: বিএনপির চিঠিতে ৪৫ জন কর্মকর্তাকে উপদেষ্টা মনোনীত করার কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে মাদারীপুর, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ইসতিয়াক আহমদকে মানিকগঞ্জ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সাবেক সচিব এম এ এন ছিদ্দিককে নরসিংদীর উপদেষ্টা মনোনীত করা হয়েছে।

এ ছাড়া সেতু বিভাগের সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামকে টাঙ্গাইল, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগমকে মুন্সীগঞ্জ, প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের জনবিভাগ সচিব সম্পদ বড়ুয়াকে কিশোরগঞ্জ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ সচিব কামাল উদ্দিন তালুকদারকে শরীয়তপুর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ ইউসুফ হারুনকে গোপালগঞ্জের উপদেষ্টা মনোনীত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) মো. আবুল কালাম আজাদকে জামালপুর, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য সুবীর কিশোর চৌধুরীকে ময়মনসিংহ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসানকে নেত্রকোনা ও নৌপরিবহন সচিব মো. আবদুস সামাদকে শেরপুরের উপদেষ্টা মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম খানকে যশোর, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. নমিতা হালদারকে বাগেরহাট, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শ্যামল কান্তি ঘোষকে ঝিনাইদহ, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হান্নানকে খুলনা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মো. আকরাম-আল-হোসেনকে মাগুরার উপদেষ্টা মনোনীত করা হয়। এ ছাড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জিল্লার রহমানকে চাঁপাই নবাবগঞ্জ, পানিসম্পদ সচিব কবির বিন আনোয়ারকে সিরাজগঞ্জ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে নওগাঁ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামালকে পাবনা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমানকে নাটোর, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব খন্দকার মো. ইফতেখার হায়দারকে রংপুর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাকসুদুল হাসান খানকে গাইবান্ধা, ভূমি সংস্কার বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহফুজুর রহমানকে কুড়িগ্রাম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক বনমালী ভৌমিককে পঞ্চগড়, জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুল ইসলামকে ঠাকুরগাঁও, প্রধান তথ্য কমিশনার মরতুজা আহমদকে সুনামগঞ্জ, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. আব্দুল জলিলকে সিলেট এবং সাবেক নৌ-পরিবহন সচিব অশোক মাধব রায়কে হবিগঞ্জের উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়।

বাকিদের মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মালেককে পটুয়াখালী, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব নাজিমউদ্দীন চৌধুরীকে ভোলা, শিল্প মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. আব্দুল হালিমকে বরিশাল, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইসমাইলকে ঝালকাঠি ও প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়াকে পিরোজপুরের দায়িত্ব দেয়া হয়। চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরাকে, বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরীকে কক্সবাজার, বিপিএটিসির সাবেক রেক্টর আ ল ম আব্দুর রহমানকে চট্টগ্রাম, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) এন এম জিয়াউল আলমকে কুমিল্লা, সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরীকে ফেনী, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইনকে নোয়াখালী, নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদকে বান্দরবান, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর মো. মোশাররফ হোসেনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাকছুদুর রহমানকে চাঁদপুর জেলার উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়।

এদিকে নির্বাচন কমিশনে দেয়া এক চিঠিতে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি), জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশ সদর দপ্তরের বদলির দাবি জানিয়েছে বিএনপি। পাশাপাশি প্রশাসন ও পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়েও বদলির কথাও বলা হয়েছে চিঠিতে। ওই দাবি নাকচ করে ইসি জানিয়েছে, ঢালাও রদবদল প্রস্তাব গ্রহণ করবে না ইসি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিএনপির চিঠিতে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বদলির কথা জানিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসি, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশ সদর দপ্তরের মাঠ প্রশাসনে বদলি করতে হবে।

বদলির ক্ষেত্রে ব্যাচের সিনিয়রিটি ও মেধাক্রম অনুসরণ করতে হবে। সকল বিভাগীয় কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে প্রত্যাহার করতে হবে। সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বর্তমান কর্মস্থল জেলার বাইরে বদলি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত এবং মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বা সমমানদের পিএস বা এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে তাদের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট পদে পদায়ন করা যাবে না। সকল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করতে হবে। পদোন্নতিবঞ্চিত সকল যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে হবে।

উৎসঃ মানবজমিন

আরও পড়ুনঃ নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মুখে ইসির তালা


৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকদের মুখে তালা ঝুলিয়ে দিলো নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাধা থাকবে না; কিন্তু তারা ভোটকেন্দ্রে ব্যালট ছিনতাই, ভোটকেন্দ্র দখল ও অনিয়ম দেখলেও কেউ মুখ খুলতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে গতকাল ইসি সচিব সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, নির্বাচনে পর্যবেক্ষকরা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষন করবেন। ভোটগ্রহণের সময় যতই ঝামেলা হোক না কেন মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না; মিডিয়ায় কথা বলতে পারবেন না। গতকাল আগারগাঁস্থ নির্বাচন ভবনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ১১৮টি পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিদের এক ব্রিফিং ইসি সচিব এসব কথা বলেন।

ইসি অতিরিক্ত সচিব মোঃ মাখলেসুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তৃতা করেন যুগ্ম সচিব খন্দকার মিজানুর রহমান ও এএসএম আসাদুজ্জামান। এবার নির্বাচনে ৪০ হাজার ২০০টি কেন্দ্রের প্রতিটিতে একজন করে পর্যবেক্ষক রাখার একটা নীতিমালা করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের বয়স ২৫ বছরের নিচে নয় এবং এসএসসি পাসের যোগ্যতা থাকতে হবে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে স্থানীয় নিবন্ধিত ১১৮টি সংস্থাকে ২১ নভেম্বরের মধ্যে ইসিতে আবেদন করতে হবে। আর বিদেশি পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করবে বলে ইসি প্রত্যাশা করছে। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে আগামী ২৫ নভেম্বর পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, তথ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসবে নির্বাচন কমিশন। এর আগে আগামী ২২ নভেম্বর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষকরা কোনো লাইভ প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না কোনো ইন্টারভিউ দিতে পারবেন না জানিয়ে পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিদের উদ্দেশে সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, যখন আপনারা পর্যবেক্ষক নিয়োগ করবেন তখন কয়েকটি সাবধান বাণী উচ্চারণ করবেন। নির্বাচন কমিশনের দেয়া পরিচয়পত্র সার্বক্ষণিক গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে। যাতে যে কেউ বুঝতে পারেন যে আপনি একজন পর্যবেক্ষক। প্রথমে কেন্দ্রে গিয়ে প্রিসাইডিং অফিসারকে তার পরিচয় দিতে হবে। কেন্দ্রে কোনো মোবাইল ফোন নেয়া যাবে না। কোনো ছবি তুলতে পারবে না, কোনো কমেন্টস করতে পারবে না। শুধু মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করবে। কেন্দ্রে ভোট নিয়ে যত প্রবলেমই হোক সে পর্যবেক্ষণ করে আপনার কাছে একটি রিপোর্ট পেশ করবেন।

তারপর আপনি সবার কাছ থেকে রিপোর্ট নিয়ে কম্পাইল করে আমাদের কাছে প্রতিবেদন দিবেন। পর্যবেক্ষণের সময় গোপন কক্ষে যাওয়া যাবে না, কাউকে নির্দেশনা দিতে পারবে না। প্রিসাইডিং, পোলিং অফিসারকে কোনো পরামর্শ দিতে পারবে না। এগুলো ক্লিয়ার করে বলে দেবেন। যদি কেন্দ্রে অনিয়ম হয়, এটা তারা কমিশনকে অবহিত করতে পারেন বা আপনাকে লিখিতভাবে অবহিত করতে পারেন।

ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, অনেক সাংবাদিক তাদের সামনে ক্যামেরা ধরবেন, উনি (পর্যবেক্ষক) কিন্তু কথা বলতে পারবেন না। কোনো সংবাদ পত্রে লাইভে কথা বলতে পারবে না, কমেন্টস করতে পারবে না। ব্রিটেনের পুলিশের মতো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে শুধু পর্যবেক্ষণ করবে। আপনাদের কাছে লিখিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার আগে কোনো মন্তব্য নয়। আপনারাও যখন কম্পাইল করে জমা দেবেন, তার আগে আপনারাও কোনো কমেন্টস করবেন না। রিপোর্ট কম্পাইল হলে প্রয়োজনে সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন। আপনাদের আচরণ হবে নিউট্রাল। এমন কোনো ব্যক্তিকে আপনারা নিয়োগ করবে না যে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য। এগুলো আপনাদের খেয়াল রাখতে হবে। একটা জিনিস খেয়াল রাখবেন নিবন্ধন যাতে বাতিল না হয়। সে দিকে আপনারা খুব বেশি খেয়াল রাখবেন। আপনারা অনেকে কিন্তু এনজিও হিসেবে কাজ করেন। অন্যান্য কাজের পাশাপাশি আপনারা নির্বাচনেও কাজ করেন। কিন্তু এখান থেকে যদি আমরা রিপোর্ট দেই যে, আপনি এই ধরণের একটি আচরণ করেছেন। যেটার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়াটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। তাহলে কিন্তু আপনার নিবন্ধনটা বাতিল করার জন্য যারা নিবন্ধন দেয় তাদেরকেও আমরা চিঠি দিয়ে দেবো। বি কেয়ারফুল। এমন কোনো কাজ করবেন না যেটার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়া ভÐুল হতে পারে বা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

উৎসঃ  ইনকিলাব

আরও পড়ুনঃ আমাদের নির্বাচনের দিনটি চুরি-ডাকাতির দিন হয়ে গেছে : শাহদীন মালিক

সংবিধানের সমতার ধারণার সঙ্গে কোটা পদ্ধতি বাতিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ : ড. শাহদীন মালিক

এখন থেকে এক-দেড় মাস আগেও যদি আমার কাছে জানতে চাওয়া হতো নির্বাচন কেমন হবে? তখন সবার মতো আমিও উত্তর দিতাম খুব সম্ভবত একতরফা নির্বাচন হবে। এখন ওই জায়গা থেকে আমরা একটু এগিয়েছি। শেষ মুহূর্তে যদি কোনো অঘটন না ঘটে তাহলে একতরফা নির্বাচন হবে- এটা বলা যাবে না। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে এক-দেড় মাস আগে যা মনে হতো তার তুলনায় নির্বাচন অনেক ভালো হবে।

মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনের শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। ধানমন্ডির চেম্বারে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের রাজনীতি, সামাজিক সংকটসহ নানা ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন।

ড. শাহদীন মালিক বলেন, নির্বাচনের দিনটি হচ্ছে ঈদের মতো। ঈদের দিনে আমরা চুরি করতে বের হই না। আনন্দ করতে বের হই। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে, ভালো খাওয়া খেতে বের হই।

কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয় বহু বছর ধরে আমাদের নির্বাচনের দিনটি একটি চুরি-ডাকাতির দিন হয়ে গেছে। নির্বাচনের দিন আমাদের লোকজন এটাকে ঈদের দিন না ভেবে কারচুপি বা কারসাজি করে জেতার মতো একটি খেলা মনে করে। এটা যতোদিন দেশের লোকজন ভাবতে থাকবে ততোদিন দেশে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।

এখানে দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত আমাদের ভাবতে হবে নির্বাচনটা কারচুপি বা কারসাজির ব্যাপার না। এবং আমাদের নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্ত হতে হবে। তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের আগে বা নির্বাচনের দিন কতটুকু শক্ত হতে পারবে সে সম্পর্কে আমার এই মুহূর্তে প্রচুর সন্দেহ আছে। এ পর্যন্ত তাদের যে কাজকর্ম তা থেকে তাদের প্রতি খুব বেশি আস্থার জায়গা তৈরি হয় নি। অতএব এখন আমাদের উচিত সবাইকে মনে করিয়ে দেয়া ‘নির্বাচনের দিনটি আমাদের ঈদের মতো পবিত্র ও আনন্দের দিন, এটা কারচুপি বা কারসাজি করার দিন না’। তারপরেও যেকোনো দেশে যেকোনো নির্বাচনে শতকরা ২ থেকে ৫ ভাগ লোক বেআইনি কাজ করে থাকে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে ওই জায়গায় পক্ষপাতিত্ব না করে শক্ত হতে হবে। তরুণ ভোটারদের বলবো, কি হবে না হবে কিংবা ভালো-মন্দ না ভেবে আপনারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিন।

পল্টনের ঘটনায় ইসির ভূমিকা বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনো গণতন্ত্রের নির্বাচন বলতে যা বোঝায় সেটা থেকে আমরা অনেক পেছনে রয়েছি। আমাদের নির্বাচনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো শক্তি প্রদর্শনের মহড়া। এখন জাতিগতভাবে আমরা যদি মনে করি নির্বাচনে জিততে হলে বা ভালো করতে হলে আমাদের ২ শ’ মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। অথবা যারা কর্মী আছে তারাও বলে থাকেন আমাদের নেতার কত প্রভাব, কত ভালো ও কত বড় কাজ করবে- সেটা দেখাতে হলে ২ থেকে ৩ শ’ মোটরসাইকেল নিয়ে নামতে হবে। নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের কিছু অদ্ভুত ধারণা আছে।

এই অদ্ভুত ধারণাগুলো যতোদিন থাকবে ততোদিন আমি বলবো যে বেচারা নির্বাচন কমিশন কিন্তু ব্যাক সিটেই থাকবে। এখন খুব পাক্কা জগতে নির্বাচন কমিশনও নেই। ইউরোপ- আমেরিকার মতো দেশগুলোতে এরকম শক্তির মহড়া, ভোট জালিয়াতি, ব্যালট চুরি এগুলো ওদের নির্বাচনের অংশ হিসেবে বহু দশক ধরেই চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের নির্বাচন কমিশনের জন্য কাজটা সবসময়ই কঠিন। কঠিন এই কাজটি আরো ভালো করা যেতো যদি তারা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির ব্যাপারে বৈষম্য না দেখাতো বা না দেখালেই ভালো হতো। সবাই সুযোগ পেলেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে। যেকোনো ভাবে। এটা মাইক ব্যবহারে হোক, রঙিন পোস্টার, ভয়ভীতি দেখানোসহ বিভিন্নভাবে। সারা দেশের সবাই যদি এটাতে মেতে যায় তাহলে নির্বাচন কমিশন কী করবে? তবে হ্যাঁ, নির্বাচন কমিশনকে সব জায়গায় খুঁটিনাটি না দেখে কিছু দৃশ্যমান দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। সেটা হলেই হয়তো অনেক জিনিসের সমাধান চলে আসবে।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ডাণ্ডাপেটা করে নির্বাচন করতে পারবে না। এটা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয়। তার কথা লোকে শুনবে, তার প্রতি আস্থাশীল থাকবে, তার কথা মেনে নেবে- এরজন্য নৈতিক উচ্চাবস্থানে তাদের থাকার কথা ছিল। গত ১৮ থেকে ২০ মাসে অনেকগুলো নির্বাচন হয়েছে। এইসব নির্বাচনের ফলে তাদের (ইসি) প্রতি খুব বেশি আস্থা তৈরি হয় নি। আস্থার অনেক ঘাটতি আছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীলতা অনেক বাড়ে। কিন্তু শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের কথা লোকে বিশ্বাস না করলে ডাণ্ডা পেটা করে বিশ্বাস করাবো- এমন ভাবলে সে নির্বাচন করা যাবে না। তাদের প্রতি যে আস্থার ঘাটতি হয়েছে এই মুহূর্তে আমি মনে করি তাদের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা একটি বড় অন্তরায়।

তফসিল ঘোষণার পর কি পরিবর্তন হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রখ্যাত এই আইনজীবী বলেন, পরিবর্তন তো হয়েছে। সব দলই বিশেষ করে ঐক্যফ্রন্টসহ সবাই বলছে এখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। বেশ কয়েকটি জোটের ছোট ছোট শরিক দলগুলো বলেছে জোটগতভাবে তারা ধানের শীষ বা প্রধান দলের মার্কা দিয়ে নির্বাচন করবে। এগুলো নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক দিক।

পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা নিঃসন্দেহে ইতিবাচকভাবে দেখছি। এখানে আমার মনে হয় দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত বিএনপির একটু দোদুল্যমানতা ছিল। কিছুটা সাংগঠনিক দুর্বলতাও ছিল। এবং তারা এককভাবে তাদের ২০দলীয় জোট নিয়ে ভালো নির্বাচন করতে পারবে কি-না এটা নিয়ে আমার মনে হয় বিএনপির মধ্যে কিছু আশঙ্কা ছিল। এখন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট হওয়াতে এখানে আ.স.ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাদের নিয়ে একটি জোট গঠন হয়েছে। তারা একসঙ্গে আসাতে একটি বিরোধী বড় মোর্চা হিসেবে শক্তি তৈরি হয়েছে। ফলে তাদের কাঙ্ক্ষিত ভালো নির্বাচন পাওয়ার প্রত্যাশাটা বেড়েছে। ড. কামাল হোসেন গত ৫০ বছর ধরেই সামনে আছেন। এবং রাজনীতিতে আছেন। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টে আসার পরে তার বিরুদ্ধে বেশকিছু অহেতুক কুৎসা রটনা হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি মনে করি আমাদের রাজনীতিতে একজন নীতিবান লোক হিসেবে তার অবস্থান সবার উপরে। যেকোনো মানুষের দুর্বলতা থাকে, গাফিলতি থাকে। কারণ আমরা মানুষ, আমাদের কেউ ফেরেশতা না।

এই হিসেবে ড. কামালের নিশ্চয়ই কিছু দুর্বলতা আছে। নিশ্চয়ই তাকে সমালোচনা করা যাবে। কিন্তু সবকিছু আমলে নিয়ে এটা বলা যাবে যে, নীতি- নৈতিকতার বিচারে তার স্থান এখন অনেক উপরে। এখানে লক্ষণীয় দুটি বিষয় রয়েছে। একটি হচ্ছে সবাই মিলে জোট গঠন, অন্যটি ড. কামাল হোসেনের ওপর সাধারণ মানুষের যে শ্রদ্ধা- এই দুটি মিলিয়ে আমার মনে হয় নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডটা আগের থেকে অনেক ভালো হয়েছে। আগে যেটা একতরফা নির্বাচন হতে যাচ্ছিল। এখন ঐক্যফ্রন্ট আসাতে ড. কামালসহ অন্যরা আসাতে একতরফা নির্বাচনের আশঙ্কাটা অনেক কমে গেছে।

সংসদ ভাঙতে সংবিধান বাধা তত্ত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, সংবিধানে কোনো বাধা নেই। এখন সংবিধান যদি কেউ না পড়ে বা না বোঝার চেষ্টা করে সেটা অন্য কথা। সংসদীয় গণতন্ত্রে ধরেই নেয়া হয় যে, সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেয়া হবে। সংবিধানে আমাদের দুটি পন্থাই বলে দেয়া হয়েছে। সংসদ ভেঙে না দিয়ে আমাদের দেশে বা সারা দুনিয়ার প্রথা বা চর্চার দৃষ্টিতে সেটা একটি ব্যতিক্রম। কখনো এটা দরকার হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে যদি দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, বিরাট বন্যা, সাইক্লোন দেখা দেয়। এরকম পরিস্থিতিতে তখন হয়তো সংসদ রেখে নির্বাচন করতে হবে। অন্যদিকে কেউ নিশ্চয় দ্বিমত করবে না যে, সংসদ রেখে নির্বাচন করলে যে দলের সংসদ সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আছেন তারা তো নিঃসন্দেহে সুবিধা পাবেন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অনেক আচরণবিধির কথা বলা হয়। কিন্তু আপনাকে ২ হাত বেঁধে আর আমার ২ হাত খোলা রেখে যদি পুকুরে নামিয়ে দেয়া হয় সাঁতার প্রতিযোগিতায়। তখন তো আপনি ডুবে যাবেন। তখন যদি বলা হয় আপনারা তো একই পুকুরে সাঁতরাচ্ছেন। আপনি হাত বাঁধা অবস্থায় সাঁতরাতে পারছেন না কেন? এটা তো অবাস্তব কথা। সংসদ বহাল রেখে তাদের আচরণবিধি স্তিমিত করা মনে হয় অবাস্তব।

গত ৫ বছরে বাংলাদেশের প্রায় সব নির্বাচন নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, দুনিয়ার বহু দেশ আমাদের মতো এই অসুস্থ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গেছে। কোনো দেশে নির্বাচন একদিনেই সুষ্ঠু হয়নি। এক্ষেত্রে আমাদের সময়টা খুব বেশি লেগে যাচ্ছে। এখন মনে হয় আমাদের রাজনীতির সঙ্গে যারা সরাসরি সম্পৃক্ত তারা যদি মনে করেন যে নির্বাচনটা হলো টাকার খেলা, শক্তি প্রদর্শন বা মহড়া প্রদর্শন, প্রভাব খাটানোর খেলা ততোদিন কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে আমরা যেতে পারবো না। তবে ১টি বিষয় করা যেতে পারে। আনুপাতিক হারে নির্বাচন। যেটা শ্রীলঙ্কা ও নেপালে আছে। সারা দেশের সব লোক ভোট দেবেন। তারপরে প্রাপ্য ভোটের হার অনুযায়ী তখন আসন বণ্টন হবে। যে যতো সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে সে ততো বেশি আসন পাবে। যে সংখ্যাগরিষ্ঠ কম হবে সে ততো কম আসন পাবে। তখন এই আসনভিত্তিক নির্বাচনটা চলে যাবে। নির্বাচনে অনিয়মগুলোও কমবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তখন একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু ২০০৮ বা তার আগের নির্বাচনে ভোট দিতে পেরেছে। আমি আশা করবো আগামী নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারবে।

তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা যে দেশের উন্নতির জন্য প্রয়োজন এই চিন্তাটা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এখনো আসেনি। তাদের চিন্তা হলো দেশ গড়া বা দেশের উন্নয়ন করা। মানে ভালো রাস্তা গড়া, ভালো ব্রিজ করা, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যুৎ এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এখানে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় অনেক পেছনে। খাদ্যদ্রব্যের দাম কমানো এগুলোই হলো তাদের অগ্রাধিকার। একটি দেশ তখনই উন্নত হয় যখন তারা বুঝতে পারে যে এগুলোর (ফিজিক্যাল উন্নয়ন) সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তোলা এটা কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ না বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নেতারা যখন বুঝতে শুরু করবে যে রাস্তাঘাটের উন্নয়নের থেকে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং শক্তিশালী করা অন্তত সমান গুরুত্বপূর্ণ। তখন প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে।

সিভিল সোসাইটির ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি মনে করি সিভিল সোসাইটির ভূমিকা গৌণ হচ্ছে না। সিভিল সোসাইটির কাজ দেশ চালানো বা রাজনীতি করা না। দেশে যে কাজগুলো হচ্ছে তার দুর্বলতাগুলো ধরিয়ে দেয়া বা তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তাদের ভূমিকা কিন্তু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ একটি বুদ্ধিভিত্তিক অবস্থান। তাদের ভূমিকা আপ’স অ্যান্ড ডাউন হতে পারে কিন্তু খুব বেশি কমে গেছে বলে আমি মনে করি না। আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল।

উৎসঃ  মানবজমিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here