এখন থেকে এক-দেড় মাস আগেও যদি আমার কাছে জানতে চাওয়া হতো নির্বাচন কেমন হবে? তখন সবার মতো আমিও উত্তর দিতাম খুব সম্ভবত একতরফা নির্বাচন হবে। এখন ওই জায়গা থেকে আমরা একটু এগিয়েছি। শেষ মুহূর্তে যদি কোনো অঘটন না ঘটে তাহলে একতরফা নির্বাচন হবে- এটা বলা যাবে না। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে এক-দেড় মাস আগে যা মনে হতো তার তুলনায় নির্বাচন অনেক ভালো হবে।

মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনের শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। ধানমন্ডির চেম্বারে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের রাজনীতি, সামাজিক সংকটসহ নানা ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন।

ড. শাহদীন মালিক বলেন, নির্বাচনের দিনটি হচ্ছে ঈদের মতো। ঈদের দিনে আমরা চুরি করতে বের হই না। আনন্দ করতে বের হই। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে, ভালো খাওয়া খেতে বের হই।

কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয় বহু বছর ধরে আমাদের নির্বাচনের দিনটি একটি চুরি-ডাকাতির দিন হয়ে গেছে। নির্বাচনের দিন আমাদের লোকজন এটাকে ঈদের দিন না ভেবে কারচুপি বা কারসাজি করে জেতার মতো একটি খেলা মনে করে। এটা যতোদিন দেশের লোকজন ভাবতে থাকবে ততোদিন দেশে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।

এখানে দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত আমাদের ভাবতে হবে নির্বাচনটা কারচুপি বা কারসাজির ব্যাপার না। এবং আমাদের নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্ত হতে হবে। তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের আগে বা নির্বাচনের দিন কতটুকু শক্ত হতে পারবে সে সম্পর্কে আমার এই মুহূর্তে প্রচুর সন্দেহ আছে। এ পর্যন্ত তাদের যে কাজকর্ম তা থেকে তাদের প্রতি খুব বেশি আস্থার জায়গা তৈরি হয় নি। অতএব এখন আমাদের উচিত সবাইকে মনে করিয়ে দেয়া ‘নির্বাচনের দিনটি আমাদের ঈদের মতো পবিত্র ও আনন্দের দিন, এটা কারচুপি বা কারসাজি করার দিন না’। তারপরেও যেকোনো দেশে যেকোনো নির্বাচনে শতকরা ২ থেকে ৫ ভাগ লোক বেআইনি কাজ করে থাকে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে ওই জায়গায় পক্ষপাতিত্ব না করে শক্ত হতে হবে। তরুণ ভোটারদের বলবো, কি হবে না হবে কিংবা ভালো-মন্দ না ভেবে আপনারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিন।

পল্টনের ঘটনায় ইসির ভূমিকা বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনো গণতন্ত্রের নির্বাচন বলতে যা বোঝায় সেটা থেকে আমরা অনেক পেছনে রয়েছি। আমাদের নির্বাচনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো শক্তি প্রদর্শনের মহড়া। এখন জাতিগতভাবে আমরা যদি মনে করি নির্বাচনে জিততে হলে বা ভালো করতে হলে আমাদের ২ শ’ মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। অথবা যারা কর্মী আছে তারাও বলে থাকেন আমাদের নেতার কত প্রভাব, কত ভালো ও কত বড় কাজ করবে- সেটা দেখাতে হলে ২ থেকে ৩ শ’ মোটরসাইকেল নিয়ে নামতে হবে। নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের কিছু অদ্ভুত ধারণা আছে।

এই অদ্ভুত ধারণাগুলো যতোদিন থাকবে ততোদিন আমি বলবো যে বেচারা নির্বাচন কমিশন কিন্তু ব্যাক সিটেই থাকবে। এখন খুব পাক্কা জগতে নির্বাচন কমিশনও নেই। ইউরোপ- আমেরিকার মতো দেশগুলোতে এরকম শক্তির মহড়া, ভোট জালিয়াতি, ব্যালট চুরি এগুলো ওদের নির্বাচনের অংশ হিসেবে বহু দশক ধরেই চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের নির্বাচন কমিশনের জন্য কাজটা সবসময়ই কঠিন। কঠিন এই কাজটি আরো ভালো করা যেতো যদি তারা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির ব্যাপারে বৈষম্য না দেখাতো বা না দেখালেই ভালো হতো। সবাই সুযোগ পেলেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে। যেকোনো ভাবে। এটা মাইক ব্যবহারে হোক, রঙিন পোস্টার, ভয়ভীতি দেখানোসহ বিভিন্নভাবে। সারা দেশের সবাই যদি এটাতে মেতে যায় তাহলে নির্বাচন কমিশন কী করবে? তবে হ্যাঁ, নির্বাচন কমিশনকে সব জায়গায় খুঁটিনাটি না দেখে কিছু দৃশ্যমান দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। সেটা হলেই হয়তো অনেক জিনিসের সমাধান চলে আসবে।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ডাণ্ডাপেটা করে নির্বাচন করতে পারবে না। এটা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয়। তার কথা লোকে শুনবে, তার প্রতি আস্থাশীল থাকবে, তার কথা মেনে নেবে- এরজন্য নৈতিক উচ্চাবস্থানে তাদের থাকার কথা ছিল। গত ১৮ থেকে ২০ মাসে অনেকগুলো নির্বাচন হয়েছে। এইসব নির্বাচনের ফলে তাদের (ইসি) প্রতি খুব বেশি আস্থা তৈরি হয় নি। আস্থার অনেক ঘাটতি আছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীলতা অনেক বাড়ে। কিন্তু শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের কথা লোকে বিশ্বাস না করলে ডাণ্ডা পেটা করে বিশ্বাস করাবো- এমন ভাবলে সে নির্বাচন করা যাবে না। তাদের প্রতি যে আস্থার ঘাটতি হয়েছে এই মুহূর্তে আমি মনে করি তাদের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা একটি বড় অন্তরায়।

তফসিল ঘোষণার পর কি পরিবর্তন হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রখ্যাত এই আইনজীবী বলেন, পরিবর্তন তো হয়েছে। সব দলই বিশেষ করে ঐক্যফ্রন্টসহ সবাই বলছে এখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। বেশ কয়েকটি জোটের ছোট ছোট শরিক দলগুলো বলেছে জোটগতভাবে তারা ধানের শীষ বা প্রধান দলের মার্কা দিয়ে নির্বাচন করবে। এগুলো নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক দিক।

পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা নিঃসন্দেহে ইতিবাচকভাবে দেখছি। এখানে আমার মনে হয় দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত বিএনপির একটু দোদুল্যমানতা ছিল। কিছুটা সাংগঠনিক দুর্বলতাও ছিল। এবং তারা এককভাবে তাদের ২০দলীয় জোট নিয়ে ভালো নির্বাচন করতে পারবে কি-না এটা নিয়ে আমার মনে হয় বিএনপির মধ্যে কিছু আশঙ্কা ছিল। এখন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট হওয়াতে এখানে আ.স.ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাদের নিয়ে একটি জোট গঠন হয়েছে। তারা একসঙ্গে আসাতে একটি বিরোধী বড় মোর্চা হিসেবে শক্তি তৈরি হয়েছে। ফলে তাদের কাঙ্ক্ষিত ভালো নির্বাচন পাওয়ার প্রত্যাশাটা বেড়েছে। ড. কামাল হোসেন গত ৫০ বছর ধরেই সামনে আছেন। এবং রাজনীতিতে আছেন। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টে আসার পরে তার বিরুদ্ধে বেশকিছু অহেতুক কুৎসা রটনা হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি মনে করি আমাদের রাজনীতিতে একজন নীতিবান লোক হিসেবে তার অবস্থান সবার উপরে। যেকোনো মানুষের দুর্বলতা থাকে, গাফিলতি থাকে। কারণ আমরা মানুষ, আমাদের কেউ ফেরেশতা না।

এই হিসেবে ড. কামালের নিশ্চয়ই কিছু দুর্বলতা আছে। নিশ্চয়ই তাকে সমালোচনা করা যাবে। কিন্তু সবকিছু আমলে নিয়ে এটা বলা যাবে যে, নীতি- নৈতিকতার বিচারে তার স্থান এখন অনেক উপরে। এখানে লক্ষণীয় দুটি বিষয় রয়েছে। একটি হচ্ছে সবাই মিলে জোট গঠন, অন্যটি ড. কামাল হোসেনের ওপর সাধারণ মানুষের যে শ্রদ্ধা- এই দুটি মিলিয়ে আমার মনে হয় নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডটা আগের থেকে অনেক ভালো হয়েছে। আগে যেটা একতরফা নির্বাচন হতে যাচ্ছিল। এখন ঐক্যফ্রন্ট আসাতে ড. কামালসহ অন্যরা আসাতে একতরফা নির্বাচনের আশঙ্কাটা অনেক কমে গেছে।

সংসদ ভাঙতে সংবিধান বাধা তত্ত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, সংবিধানে কোনো বাধা নেই। এখন সংবিধান যদি কেউ না পড়ে বা না বোঝার চেষ্টা করে সেটা অন্য কথা। সংসদীয় গণতন্ত্রে ধরেই নেয়া হয় যে, সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেয়া হবে। সংবিধানে আমাদের দুটি পন্থাই বলে দেয়া হয়েছে। সংসদ ভেঙে না দিয়ে আমাদের দেশে বা সারা দুনিয়ার প্রথা বা চর্চার দৃষ্টিতে সেটা একটি ব্যতিক্রম। কখনো এটা দরকার হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে যদি দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, বিরাট বন্যা, সাইক্লোন দেখা দেয়। এরকম পরিস্থিতিতে তখন হয়তো সংসদ রেখে নির্বাচন করতে হবে। অন্যদিকে কেউ নিশ্চয় দ্বিমত করবে না যে, সংসদ রেখে নির্বাচন করলে যে দলের সংসদ সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আছেন তারা তো নিঃসন্দেহে সুবিধা পাবেন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অনেক আচরণবিধির কথা বলা হয়। কিন্তু আপনাকে ২ হাত বেঁধে আর আমার ২ হাত খোলা রেখে যদি পুকুরে নামিয়ে দেয়া হয় সাঁতার প্রতিযোগিতায়। তখন তো আপনি ডুবে যাবেন। তখন যদি বলা হয় আপনারা তো একই পুকুরে সাঁতরাচ্ছেন। আপনি হাত বাঁধা অবস্থায় সাঁতরাতে পারছেন না কেন? এটা তো অবাস্তব কথা। সংসদ বহাল রেখে তাদের আচরণবিধি স্তিমিত করা মনে হয় অবাস্তব।

গত ৫ বছরে বাংলাদেশের প্রায় সব নির্বাচন নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, দুনিয়ার বহু দেশ আমাদের মতো এই অসুস্থ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গেছে। কোনো দেশে নির্বাচন একদিনেই সুষ্ঠু হয়নি। এক্ষেত্রে আমাদের সময়টা খুব বেশি লেগে যাচ্ছে। এখন মনে হয় আমাদের রাজনীতির সঙ্গে যারা সরাসরি সম্পৃক্ত তারা যদি মনে করেন যে নির্বাচনটা হলো টাকার খেলা, শক্তি প্রদর্শন বা মহড়া প্রদর্শন, প্রভাব খাটানোর খেলা ততোদিন কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে আমরা যেতে পারবো না। তবে ১টি বিষয় করা যেতে পারে। আনুপাতিক হারে নির্বাচন। যেটা শ্রীলঙ্কা ও নেপালে আছে। সারা দেশের সব লোক ভোট দেবেন। তারপরে প্রাপ্য ভোটের হার অনুযায়ী তখন আসন বণ্টন হবে। যে যতো সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে সে ততো বেশি আসন পাবে। যে সংখ্যাগরিষ্ঠ কম হবে সে ততো কম আসন পাবে। তখন এই আসনভিত্তিক নির্বাচনটা চলে যাবে। নির্বাচনে অনিয়মগুলোও কমবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তখন একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু ২০০৮ বা তার আগের নির্বাচনে ভোট দিতে পেরেছে। আমি আশা করবো আগামী নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারবে।

তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা যে দেশের উন্নতির জন্য প্রয়োজন এই চিন্তাটা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এখনো আসেনি। তাদের চিন্তা হলো দেশ গড়া বা দেশের উন্নয়ন করা। মানে ভালো রাস্তা গড়া, ভালো ব্রিজ করা, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যুৎ এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এখানে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় অনেক পেছনে। খাদ্যদ্রব্যের দাম কমানো এগুলোই হলো তাদের অগ্রাধিকার। একটি দেশ তখনই উন্নত হয় যখন তারা বুঝতে পারে যে এগুলোর (ফিজিক্যাল উন্নয়ন) সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তোলা এটা কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ না বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নেতারা যখন বুঝতে শুরু করবে যে রাস্তাঘাটের উন্নয়নের থেকে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং শক্তিশালী করা অন্তত সমান গুরুত্বপূর্ণ। তখন প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে।

সিভিল সোসাইটির ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি মনে করি সিভিল সোসাইটির ভূমিকা গৌণ হচ্ছে না। সিভিল সোসাইটির কাজ দেশ চালানো বা রাজনীতি করা না। দেশে যে কাজগুলো হচ্ছে তার দুর্বলতাগুলো ধরিয়ে দেয়া বা তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তাদের ভূমিকা কিন্তু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ একটি বুদ্ধিভিত্তিক অবস্থান। তাদের ভূমিকা আপ’স অ্যান্ড ডাউন হতে পারে কিন্তু খুব বেশি কমে গেছে বলে আমি মনে করি না। আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল।

উৎসঃ  মানবজমিন

আরও পড়ুনঃ অন্য কারও সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বৈঠক নয়: ইসি


একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ডেকে কেউ যেন বৈঠক কিংবা ব্রিফ করতে না পারেন সে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)

বিএনপির করা এ-সংক্রান্ত এক অভিযোগের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২০ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের প্রধানমন্ত্রীর দফতরে ডেকে নিয়ে ব্রিফ করা হচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার (২০ নভেম্বর) বিএনপির পক্ষ থেকে দলের যুগ্ম-মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের কাছে এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগপত্র জমা দেন।

দলটির অভিযোগ, সরকারি দলের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, ‘আজকে মাননীয় কমিশন একটি নির্দেশনা দিয়েছে, সবগুলো বিষয় মিলিয়ে সরকারকে আমরা একটা পত্র দেবো। সিদ্ধান্ত হয়েছে এ রকম- পত্রপত্রিকায় ইতোমধ্যে যেসব অভিযোগ উঠেছে ভবিষ্যতে যাতে সেগুলো আর না করা হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনের অধীন হওয়ায় তাদের যাতে অন্য কোনও ভাবে কেউ ডেকে ব্রিফ না করে। এসব ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নির্বাচন কমিশন তা তদন্ত করে দেখবে। সব কিছু বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।’

সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, ‘নির্বাচন কর্মকর্তারা জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা। কোনও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে কমিশন তা খতিয়ে দেখবে, তলিয়ে দেখবে, তদন্ত করবে, তারপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রির্টানিং কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে সভা করা হয়েছে- এটা আচরণবিধি লঙ্ঘন কিনা- সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা অভিহিত নই। যেহেতু একটি অভিযোগ এসেছে, আমরা খতিয়ে দেখবো।’

বিএনপির অভিযোগ তাদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে আসার পথে সাদা পোশাকের লোকজন কাউকে কাউকে তুলে নিচ্ছে- এর জবাবে হেলালুদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ বিষয়টিও আমাদের জানা নেই। আমরা অভিযোগ পেলে তবেই ব্যবস্থা নেবো।’

ইসি সচিবের শাস্তি ও বদলির ব্যাপারে বিএনপির দাবির প্রেক্ষিতে হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের যে সিদ্ধান্তগুলো হয়, ওই সিদ্ধান্তের মুখপাত্র হিসেবে ও সাচিবিক দায়িত্ব পালনের জন্য ইসি সচিব সকল ধরনের কাজ করে থাকে। এখানে নির্বাচন কমিশন সচিবের আলাদা কোনও সত্ত্বা নেই। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব সচিবের। ইতোমধ্যে যে সিদ্ধান্তগুলো হয়েছে, সবগুলোই কিন্তু কমিশনের সিদ্ধান্ত। সচিবের নয়।’

মেনটরদের তালিকায় তার নাম থাকা নিয়ে সচিব বলে, ‘মন্ত্রিপরিষদ ১৩ নভেম্বর মেন্টর নিয়োগের আদেশটি বাতিল করেছে। জেলাতে মেন্টর নিয়োগের বিষয়টি অনেক আগে থেকেই প্রচলিত। বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন জেলায় মেনটর নিয়োগ করে থাকে।’

তফসিল ঘোষণার দিন মেন্টর নিয়োগ করা হয়েছে, তবুও কেন কমিশনকে জানানো হয়নি- এ প্রশ্নে ইসি সচিব বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি অভিহিত নই।’

বিএনপির অভিযোগ সরকারের কারণে আপনারা রেফারির ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। কেন পারছেন না? চাপটা কোথায়? এসব প্রশ্নের জবাবে হেলালুদ্দীন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এ পর্যন্ত কমিশন যতগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনাররা নিজেরা বসে নিয়েছেন। এখানে কোনও চাপে বা বিশেষ কারও পরামর্শে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।’

প্রশাসনে রদবদলের বিষয়ে বিএনপির অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘ঢালাওভাবে প্রস্তাব কমিশন গ্রহণ করবে না। প্রত্যেকটি অভিযোগ সুনির্দিষ্ট করে বলতে হবে। তখন বিষয়টি নির্বাচন কমিশন তদন্ত করবে- কী কারণে বদলি চাওয়া হচ্ছে।’

উৎসঃ  ব্রেকিংনিউজ

আরও পড়ুনঃ দুপুরে সাজার রায়, সন্ধ্যায় গ্রেফতার বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া


কথিত দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ নিয়ে যায় বলে তার আইনজীবী ইকবাল পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে আজ দুপুরে ঢাকার বিশেষ জজ-৬ আদালত সম্পদের হিসাব জমা না দেওয়ার মামলায় রফিকুল ইসলামকে তিন বছর কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন মাসের জেল দেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতে হাজির না থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।

পরিবারের সদস্যরা জানান, রফিকুল ইসলাম মিয়া সারা দিন গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে ছিলেন। বিএনপির প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কার্যক্রমে ছিলেন। সেখান থেকে বের হওয়ার পর রফিকুল ইসলাম মিয়াকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।

তার আইনজীবী ইকবাল হোসেন বলেন, প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কার্যক্রমে উপস্থিত থাকায় রফিকুল ইসলাম মিয়ার পক্ষে আদালতে সময় চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু আদালত তার আবেদন নাকচ করে রায় ঘোষণা করেন। রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করবেন রফিকুল ইসলাম।

জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০১ সালে ৭ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের নোটিশ ওই বছরের জুনের ১০ তারিখে রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রহণ করলেও কোনো জবাব দেননি।

পরে ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। পরে ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি দুদক কর্মকর্তা সৈয়দ লিয়াকত হোসেন ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে উত্তরা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

তদন্ত শেষে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর আদালতে রফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। আদালত ওই অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে গত বছরের ১৪ নভেম্বর রফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ছয়জন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

দুদকের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন দুদকের কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল।

উৎসঃ  আরটিএনএন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here