চালের বাজারে অস্থিরতাঃ আমদানি ৩৩ লাখ টন। এত চাল গেলো কোথায়?

0
23

চালের দামে আবারও অশনি সংকেত। কোন কারণ ছাড়াই বাড়ছে চালের বাজার। এদিকে চাল নিয়ে কারসাজিতে জড়িত এমন ১শ’ মালিকের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছে অটো রাইস মিল ওনার্স এসোসিয়েশন। আর কিছু মালিক চাল কেনার নামে ঋণ নিয়ে টাকা অন্য খাতে ব্যয় করছে বলে নিশ্চিত হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ৩৩ লাখ মেট্রিকটন চাল আমদানির এলসি খোলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো এতো চাল গেলো কোথায়। মূলত বাজার মনিটরিং না থাকায় চালের দাম বাড়ছে অভিযোগ ক্রেতার।

জানা গেছে, চালের বাজার বৃদ্ধির পক্ষে মত দেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন চালের বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এতে অস্থিরতার কিছু নেই। এর নীচে দাম হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের কৃষক। তার বক্তব্যের সাথে তাল মিলিয়ে দাম বৃদ্ধির পক্ষে মত দেন অর্থমন্ত্রীও। তিনি বলেন, ৪০ টাকায় চাল এটা কোনভাবেই বেশি না। এর নীচে চালের দাম নামুক এটা সরকার চায় না। এ নিয়ে কথা বলার কিছু নেই।

সরকার বলছে বাজার চালের দাম এখনও ৪০ টাকায় রয়েছে। ৪০ টাকায় চাল কোনভাবেই বেশি বলা যায় না। সরকারের মন্ত্রীদের এমন বক্তব্যে মজুদদাররা উল্লাস প্রকাশ করছে। এতে করে বাজারে কোন কারণ ছাড়াই চালের দাম বাড়ছে। সরকার সংসদে চালের দাম নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছে তা কোনভাবেই সঠিক নয়। বাজারে এখন ৬০ টাকার নীচে কোন চাল নেই। আর একটু সরু চালের দাম ৭০-৭২ টাকা। আর বাংলামতি কিংবা ১ নম্বর মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা।

চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। এদিকে চালের দাম সহনীয় রাখতে গেলো তিন মাসে সরকার প্রায় দুইশো কোটি টাকার রাজস্ব ছাড় দিয়েছে। অথচ এর সুফল পায়নি ভোক্তারা। উল্টো বাড়তি দামেই চাল কিনতে হয়েছে তাদের। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জন্য এ সুবিধা দেয়া হলেও বাস্তবে তা গেছে মিল মালিক ও আমদানিকারকদের পকেটে।

আগাম বন্যা, হাওরে ফসলহানি এবং সরকারের মজুদ কমে যাওয়ায় বাজার নিয়ন্ত্রণে গত ২০ জুন চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপরও বাজার স্বাভাবিক না হওয়ায় ঠিক একমাস পরই ডিসেম্বর পর্যন্ত বাকিতে চাল আমদানির সুযোগ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতেও কাজের কাজ কিছু না হলে আগস্ট মাসে ১০ শতাংশ শুল্ক নামিয়ে আনা হয় ২ শতাংশে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, জুন এবং জুলাই এই দুই মাসেই সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয় ১৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় দফায় শুল্ক ছাড়ের ফলে সাময়িক হিসাবে আরো ৬৫ কোটি টাকা রাজস্ব হারায় সরকার। সবমিলে রাজস্ব ক্ষতি প্রায় ২শ কোটি টাকা। কিন্তু বিপরীতে বাজার দাম তো কমেনি বরং দফায় দফায় তা বেড়েছে।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে চাল আমদানিতে এই সুবিধা দেয়া হলেও বাস্তবে এর সুফল গিয়েছে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের পকেটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি পর্যায়ে চালের শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে পণ্যটির দাম কমেছে সামান্য। সরকারের পক্ষ থেকে খোলাবাজারে চাল বিক্রি হলেও দাম তুলনামূলক বেশি।

ধান, চালের ব্যবসার জন্য মার্কেন্টাইল ব্যাংকের দিনাজপুর শাখা থেকে ঋণ নিয়েছিল মীর্জা অটো রাইস। সবশেষ মঞ্জুরি পদটির মেয়াদ গত বছর জুনে শেষ হলেও একই বছরের আগস্টে আবারও ১০ কোটি টাকার টাইম লোন সৃষ্টি করে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। এভাবে নভেম্বরে মীর্জা অটো রাইস মিলকে ৫ কোটি টাকা দেওয়া হয় ঋণ সমন্বয়ের জন্য।

আর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে জানা যায়, এই ঋণ নিয়ে ধান, চাল ব্যাবসায়ে ব্যবহার না করে অন্য খাতে ব্যবহার করেছে মীর্জা অটো রাইস। ধান, চালের ঋণ পরিশোধ বা সমন্বয় নিয়ে সারাদেশের ব্যাংকগুলোর এই চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে।
মীর্জা অটো রাইসের পরিচালক মিজানুর রহমান মীর্জা বলেন, এই রকম কিছু হয়নি। এটা আসলে একটা ভুল ইনফরমেশন। অটো রাইস মিল ওনার্স এসোসিয়েশনের নিজস্ব তদন্তে দেখা যায়, অন্তত ১’শ মিল মালিক ৫০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার পরও উল্টো চালের বাজার অস্থিতিশীল ।

বাংলাদেশ অটো রাইস মিল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম খোরশেদ আলম বলেন, চালের জন্য ৫’শ, ১ হাজার ও ২ হাজার কোটি টাকাও লোন দেওয়া হচ্ছে কোনো ব্যক্তিকে। এই টাকাটা নিয়ে তারা মজদুদারি করছে। আর যে টাকা দিয়ে মজদুদারি করছে আবার সেই জনগণের রক্ত চুষে খাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলেন, তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এখনো মিল মালিকদের কারসাজির কুফল গুনছে সাধারণ ক্রেতারা। ব্যবসায়ীরা জানান, কম মজুদের অজুহাতে বার বার দাম বাড়াচ্ছে মিল মালিকরা। বাড়তে শুরু করেছে মিনিকেটর মতো ১৬ চালের দাম।

সরকারের নানা পদক্ষেপের পরও লাগাম টানা যাচ্ছে না চালের দামে। মিনিকেট চালের দাম এখনো কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৬০-৬৫ টাকায়। সংকট না থাকলেও মিলারদের ইচ্ছায় বাড়ছে দাম বলছেন চাল ব্যবসায়ীরা। সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের।

গেল বছরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে চালের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কয়েক দফায় দাম বেড়ে মিনিকেট চালের দাম উঠে ৭০ টাকায়। বাজার নিয়ন্ত্রণে কমানো হয় শুল্ক। পাশাপাশি খোলাবাজারে চাল বিক্রি করে সরকার। এতে কেজি প্রতি ২-৪ টাকা দাম কমলেও আবার বেড়েছে দাম।
রাজধানীতে খুচরা ও পাইকারি বাজারে সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২ টাকা পর্যন্ত। মোহাম্মাদপুর কৃষি মার্কেট, বাবু বাজারে মিনিকেট নামে পরিচিত মাঝারি মানের সরু চাল বিক্রি হচ্ছে পাইকারি ৬১-৬২ টাকায়। দাম বেড়ে নাজিরশাইল চাল ৬৫- ৭০ টাকায় আর আটাশ জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা দরে। খুচরা বাজারে তা আরও কয়েক টাকা বেশী।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা মাফিক চালও পাচ্ছেন মিল থেকে, তবে গুনতে হচ্ছে বেশী দাম। মিলারদের ইচ্ছামত দাম বাড়ানোর প্রতিফলন ঘটছে বাজারে। চাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করলে সুফল পাবে না ভোক্তারা বলে মনে করে ক্যাব।

ক্যাব বলছে, চালের দাম নিয়ে দেয়া মন্ত্রীর বক্তব্য সিন্ডিকেটের পক্ষে গেছে। এতে করে বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। কোন কারণ ছাড়াই বাড়ছে চালের দাম। বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকগুলো ঋণ দিলেও সে ঋণে চাল না এনে অন্য খাতে বিনিয়োগ করে ব্যবসায়ীরা।
তবে, বাড়েনি আমদানি করা স্বর্ণা জাতের মোটা চালের দাম। সরকারি হিসেবে বর্তমানে চালের মজুদ আছে সোয়া নয় লাখ টন। চলতি অর্থবছরের সাত মাসেই আমদানি হয়েছে ২৮ লাখ মেট্রিক টনের বেশি।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে জিটুজি ভিত্তিতে এক লাখ মেট্রিকটন চাল আমদানির চুক্তি হলে এখন পর্যন্ত এসেছে মাত্র ২০ হাজার মেট্রিকটন। ভারত থেকে দেড় লাখ মেট্রিকটন আমদানির চুক্তির বিপরীতে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এক ছটাক চালও আসেনি। তবে ভিয়েতনাম থেকে আড়াই লাখ মেট্রিকটন চাল এসেছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে সাড়ে চার লাখ মেট্রিকটন চাল আমদানির চুক্তি হয়েছে গত মে মাসে। এর মধ্যে মাত্র এক লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিকটন চাল এসেছে। যা সরবরাহকারীরা থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে সংগ্রহ করেছে। কম্বোডিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল আড়াই লাখ মেট্রিকটন চালের। তবে কম্বোডিয়া আপাতত বাংলাদেশকে কোনো চাল দিচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে চাল আমদানিতে ব্যাংকগুলোয় ৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পুরোটা সময় চাল আমদানিতে ২৭ কোটি ৪১ লাখ ডলার এলসি খোলা হয়। অর্থাৎ গত বছর ১২ মাসে চাল আমদানিতে যে ব্যয় হয়েছে, চলতি অর্থবছরের শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই এর দ্বিগুণ ব্যয় হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, গত তিন মাসে চাল আমদানিতে ৯৩ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮৫ গুণ বেশি। গত অর্থবছরে প্রথম তিন মাসে চাল আমদানিতে মাত্র ৫০ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়। আলোচ্য সময় চাল আমদানিতে খোলা ৩৩ কোটি ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। গত বছর নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৩৫ লাখ ডলারের এলসি। নিষ্পত্তির হিসাবে ব্যয় বেড়েছে ৯১ গুণ। অথচ ব্যক্তিপর্যায়ে রেকর্ড পরিমাণ চাল আমদানি হলেও বাজারে দাম কমেছে খুবই সামান্য।

প্রশ্ন হলো এত চাল তাহলে গেলো কোথায়। আসল ব্যাপার হলো ভুয়া এলসি খুলে চাল আমদানির নামে ব্যাংক ঋণ নিলেও পরে এলসি বাতিল করে টাকা অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করেছেন চাল ব্যবসায়ীরা। এতে করে বাজারে চালের দাম কমছে না।

-সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম

Facebook Comments

comments

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here