খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড ইস্যুতে বাংলাদেশে নজর রাখছে বিশ্ব

0
145

বহুল আলোচিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডের রায় এবং রায়-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব।

এ বিষয়ে ইতোমধ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। ভারতসহ কয়েকটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিলেও বিষয়টি তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে।

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদর দফতরে দেয়া নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি মাত্রই আমাদের দৃষ্টি গোচর হয়েছে। আমরা উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখছি।’

এর আগে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ের প্রশ্নোত্তর পর্বে বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন একজন সাংবাদিক।

খালেদা জিয়ার সমর্থকদের ওপর পুলিশের টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের বিষয়ে ফারহান বলেন, ‘সহিংসতা কখনো কাম্য নয়। আমরা সহিংসতার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করছি। উভয়পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। ঘটনার যথাযথ পর্যবেক্ষণ শেষে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে জাতিসংঘ।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিবের ডেপুটি মুখপাত্র ফরহান হক বলেন, ‘নির্বাচনের ওপর এ রায়ের কোনো প্রভাব পড়বে কিনা, তা নিয়ে এক্ষুণি কিছু বলতে নারাজ আমরা। আমরা পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখছি। জাতিসংঘের অবস্থান সব দলের অংশগ্রহণে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পক্ষে।’

এদিকে, খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডের রায় ও রায়-পরবর্তী ঘটনায় ভারত ঢাকার পরিস্থিতি গভীর পর্যবেক্ষণে রাখছে বলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে চীনও ঢাকার ওপর বিশেষ নজর রাখছে জেনে ভারত আপাতত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে না।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনের আগে এই রায়ের ফলে খালেদা হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। একে ‘অস্বস্তিকর অবস্থায় থাকা’ আওয়ামী লীগের ‘রাজনৈতিক বিজয়’ হিসেবেও লিখেছে ভারতীয় গণমাধ্যমটি।

এ বিষয়ে অবশ্য কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস। তবে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করা সাবেক এক ভারতীয় কূটনীতিক মনে করেন, এটা একটা কৌশলগত অবস্থা। কারণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের একজন পরিচিত মিত্র।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশসমূহের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারত হস্তক্ষেপ করে না। তবে দিল্লি বিএনপির ওপর নজর রাখছে ও জামায়াত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

ভিডিওঃ রায়ের আগে সংবাদ সম্মেলনে কি বলছিলেন খালেদা জিয়া?

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে ▷ বাটনে বা ভিডিওর শিরোনামে ক্লিক করুন]

ভারতীয় ওই কূটনীতিক মনে করেন, আগামী নির্বাচনে খালেদা অংশ নিতে না পারলেও বিএনপি অংশ নেবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে, বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের, এখন তিস্তা পানি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ভারতের সাথে পরিকল্পনা করা উচিত।

এদিকে, খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
প্রভাবশালী এই চার দেশের জারিকৃত এই বার্তায় দেশগুলোর নাগরিকদের বাংলাদেশে চলাচলে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

উল্লিখিত চার দেশের ঢাকায় নিযুক্ত দূতাবাস ও হাইকমিশনের ওয়েবসাইটে এ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশে অবস্থানকারী এ দেশগুলোর নাগরিকদের জনসমাগম এড়িয়ে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এছাড়া স্থানীয় গণমাধ্যমের ওপর নজর রাখার পরামর্শও দিয়েছে এ চার দেশ। গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য প্রধান প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভ সতর্কতা জারি করে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস।

দূতাবাসের সতর্ক বার্তায় বলা হয়, বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একটি মামলার রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হতে পারে। বিক্ষোভে স্থানীয় পরিবহনসেবা, স্কুল, শপিং মল এবং অন্যান্য স্থাপনায় প্রভাব পড়তে পারে অথবা নাও পারে।

সতর্কবার্তায় বাংলাদেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের স্থানীয় গণমাধ্যমের ওপর দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া বড় ধরনের সমাবেশ, প্রতিবাদ এড়িয়ে চলা ও আশপাশের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাজ্য। বাংলাদেশে নাগরিকদের সব সময় সতর্কতা অবলম্বন ও বড় ধরনের জনসমাবেশ, রাজনৈতিক অফিস এবং সমাবেশ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার রায় ঘিরে একই ধরনের সতর্কতা জারি করেছে কানাডা। রায়-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে সহিংস আকার ধারণ করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে দেশটি। বিক্ষোভ, জনসমাবেশ এড়িয়ে চলতে ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী বাংলাদেশে নাগরিকদের চলাচলের পরামর্শ দিয়েছে কানাডা।

একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটি বলছে, রায়কে কেন্দ্র করে পরিবহনসেবা ব্যাহত হতে পারে। এজন্য নাগরিকদের সতর্কতার সঙ্গে বাংলাদেশে চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন।

বৃহস্পতিবার পুরনো ঢাকার বখশিবাজারে কারা অধিদপ্তরের মাঠে স্থাপিত ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানের আদালতে খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ডের রায় দেয়া হয়।

ফাইল ছবি

এর আগে দুপুর ২টা ১৪ মিনিটের দিকে আদালত কক্ষে প্রবেশ করেন বিচারক বিচারক ড. আখতারুজ্জামান। দুপুর ২টা ১৬ মিনিটের দিকে ৬৩২ পৃষ্ঠার রায় পড়া শুরু করেন তিনি। এর আগে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে বেগম খালেদা জিয়া আদালত চত্বরে পৌঁছান।

এর আগে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে তিনি গুলশানের নিজ বাসভবন ‘ফিরোজা’ থেকে আদালতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এরই মধ্যে রায়কে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। আদালতে যাওয়ার পথে রাজধানীর কাকরাইল মোড়ে পুলিশের সঙ্গে তার দলের কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশ ১০-১২ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এরপর কাকরাইল মোড়ে পুলিশ বক্সে ভাঙচুর করে বিএনপি কর্মীরা। সেখান থেকে আটক করা হয়েছে অনেককে।

এর আগে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মগবাজার এলাকায় এলে শত শত নেতাকর্মী সেখানে যুক্ত হন। এ সময় রাস্তার পাশেও অনেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নেতাকর্মীরা মোটর সাইকেলের বহর নিয়ে সেখানে যুক্ত হন। তারা খালেদা জিয়ার নামে স্লোগান দিয়ে এগোতে থাকেন।

এই মামলার প্রধান আসামি বিএনপির চেয়ারপারসন এবং তিনতিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ফলে দেশবাসীর আগ্রহ অন্যরকম। রায়ের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই টানটান উত্তেজনা জনমনে ছড়িয়ে পড়ে। রায়কে ঘিরে আওয়ামী লীগ-বিএনপি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতির মাঠে রায় নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে জাতীয় নির্বাচনও।

দেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে রাজধানীর বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ আদালত। এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি ওই মামলার শুনানি শেষে রায়ের দিন নির্ধারণ করেন বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান।

-আরটিএনএন

Facebook Comments

comments

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here